বাংলার ঐতিহ্যবাহী খাবারের তালিকায় খেজুরের গুড়ের নাম এলেই চোখে ভাসে শীতের সকাল, কুয়াশা আর নতুন গুড়ের মিষ্টি গন্ধ। প্রাচীনকাল থেকেই খেজুরের গুড় শুধু স্বাদের জন্য নয়, বরং এর অসাধারণ পুষ্টিগুণের জন্যও জনপ্রিয়। আধুনিক সময়েও প্রাকৃতিক ও স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যের প্রতি আগ্রহ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে খেজুরের গুড় আবার নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে।

খেজুরের গুড় মূলত খেজুর গাছের রস জ্বাল দিয়ে তৈরি করা হয়। এতে কোনো কৃত্রিম রং, ফ্লেভার বা রাসায়নিক সংযোজন থাকে না, যা একে পরিশোধিত চিনি বা কৃত্রিম মিষ্টিজাত পণ্যের তুলনায় অনেক বেশি স্বাস্থ্যকর করে তোলে। প্রাকৃতিক এই মিষ্টিতে রয়েছে নানা ধরনের ভিটামিন, খনিজ ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, যা শরীরের জন্য অত্যন্ত উপকারী।
খেজুরের গুড়ের অন্যতম প্রধান উপকারিতা হলো এটি শক্তির একটি চমৎকার উৎস। এতে থাকা প্রাকৃতিক শর্করা দ্রুত শরীরে শক্তি জোগায়, ফলে দুর্বলতা বা ক্লান্তি দূর করতে সাহায্য করে। শীতকালে বা ভারী শারীরিক পরিশ্রমের পর খেজুরের গুড় খেলে শরীর দ্রুত সতেজ অনুভব করে।
এই গুড়ে প্রচুর পরিমাণে আয়রন, ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম ও ম্যাগনেশিয়াম থাকে। আয়রন রক্তস্বল্পতা দূর করতে সহায়তা করে এবং হিমোগ্লোবিনের মাত্রা বাড়াতে সাহায্য করে। ক্যালসিয়াম হাড় ও দাঁত মজবুত রাখে, আর পটাশিয়াম হৃদযন্ত্রের কার্যক্ষমতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

হজমশক্তি উন্নত করতেও খেজুরের গুড় বেশ কার্যকর। এতে থাকা প্রাকৃতিক ফাইবার ও উপকারী উপাদান পাকস্থলীর কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে। কোষ্ঠকাঠিন্য কমাতে এবং অন্ত্র পরিষ্কার রাখতে নিয়মিত পরিমিত পরিমাণে খেজুরের গুড় খাওয়া উপকারী।
খেজুরের গুড় শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতেও সহায়ক। এতে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীর থেকে ক্ষতিকর টক্সিন দূর করে এবং নানা সংক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ঠান্ডা-কাশি বা মৌসুমি অসুস্থতায় অনেকেই ঘরোয়া প্রতিকার হিসেবে খেজুরের গুড় ব্যবহার করেন।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, খেজুরের গুড় পরিশোধিত চিনির তুলনায় রক্তে শর্করার মাত্রা তুলনামূলক ধীরে বাড়ায়। তাই পরিমিত পরিমাণে এটি ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে, যদিও ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
সবশেষে বলা যায়, খেজুরের গুড় শুধু একটি মিষ্টি উপাদান নয়, এটি আমাদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং সুস্থ জীবনের অংশ। দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় পরিমিতভাবে খেজুরের গুড় যুক্ত করলে স্বাদ যেমন বাড়বে, তেমনি শরীরও পাবে প্রাকৃতিক পুষ্টির সমৃদ্ধ ভাণ্ডার।

Add comment